বাংলাদেশ প্রতিদিন
প্রকাশিত: ২২ জুন, ২০২৬
পশ্চিমবঙ্গে দীর্ঘ ঐতিহাসিক রাজনৈতিক পালাবদলের পর রাজ্যের নতুন বিজেপি সরকার তাদের প্রথম পূর্ণাঙ্গ ও ঐতিহাসিক বাজেট পেশ করেছে। তৃণমূল কংগ্রেসের দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছরের শাসনের অবসানের পর ক্ষমতায় এসে প্রথম অর্থবর্ষের বাজেটে সরকারি কর্মচারীদের জন্য বড় ধরণের ২০ শতাংশ মহার্ঘ ভাতা (DA) বৃদ্ধি, এক লাখ শূন্যপদে জরুরি নিয়োগ, আগের সরকারের সামাজিক কল্যাণমূলক প্রকল্পগুলো বহাল রাখা এবং নারীদের জন্য সম্পূর্ণ বিনা ভাড়ায় বাসযাত্রার মতো একাধিক চমকপ্রদ ও গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
রোববার (২১ জুন) পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরের এই মেগা বাজেট পেশ করেন রাজ্যের নতুন অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত। বাজেট বক্তৃতায় তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, "নতুন সরকার রাজ্যের সার্বিক উন্নয়ন, নতুন কর্মসংস্থান এবং সামাজিক নিরাপত্তার মধ্যে একটি সুষম ভারসাম্য রেখে এগোতে চায়।" একই সঙ্গে ভঙ্গুর আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখাও নতুন সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হবে বলে তিনি জানান।
বাজেটের সবচেয়ে আলোচিত ও বহুল প্রতীক্ষিত ঘোষণা হলো রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের মহার্ঘ ভাতা (ডিএ) একলাফে ২০ শতাংশ বৃদ্ধি করা। আগামী ১ অক্টোবর থেকে নতুন এই বর্ধিত হার কার্যকর হবে। এর ফলে পশ্চিমবঙ্গের সরকারি কর্মচারী ও অবসরপ্রাপ্ত পেনশনভোগীদের মোট মহার্ঘ ভাতা বর্তমানে ৩৮ শতাংশে গিয়ে পৌঁছাবে। দীর্ঘদিন ধরে মহার্ঘ ভাতা নিয়ে রাজ্যে যে তীব্র রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক আন্দোলন-বিতর্ক চলছিল, সেই প্রেক্ষাপটে নতুন সরকারের এই ঘোষণা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ ও মাস্টারস্ট্রোক বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।
রাজ্যের কর্মসংস্থানের প্রশ্নে বেকার যুবসমাজের জন্য বড় ধরণের সুখবর ও প্রতিশ্রুতি দিয়েছে নতুন বিজেপি সরকার। অর্থমন্ত্রী জানান, বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে ধাপে ধাপে অত্যন্ত স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় মোট এক লাখ শূন্যপদে নতুন নিয়োগ সম্পন্ন করা হবে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, এই সকল পদের এক-তৃতীয়াংশ (৩৩.৩৩%) সম্পূর্ণভাবে নারীদের জন্য সংরক্ষিত বা কোটা হিসেবে থাকবে। সরকারের দাবি, এই ঐতিহাসিক উদ্যোগ রাজ্যের বেকার যুবসমাজের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করবে।
বাজেটে আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত রাজনৈতিক বার্তা দেওয়া হয়েছে সামাজিক কল্যাণমূলক প্রকল্প নিয়ে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার পরিবর্তনের পর বিরোধীদের প্রবল আশঙ্কা ও অপপ্রচার ছিল যে—বিজেপি ক্ষমতায় এলে আগের সরকারের বহু জনপ্রিয় সামাজিক প্রকল্প (যেমন লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, কন্যাশ্রী ইত্যাদি) বন্ধ করে দেওয়া হতে পারে। তবে সমস্ত জল্পনা উড়িয়ে দিয়ে অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, পূর্বতন সরকারের বিদ্যমান সব সামাজিক প্রকল্প যথারীতি চালু থাকবে। এর ফলে পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ মানুষের মধ্য থেকে অনিশ্চয়তা অনেকটাই দূর হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
পাশাপাশি, বর্তমান সরকারের নিজস্ব অন্যতম প্রধান নতুন কর্মসূচি ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’র জন্য এককালীন ৩৬ হাজার কোটি টাকা বিশাল বড় বাজেট বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এই বিপুল বরাদ্দের মাধ্যমে রাজ্যের সামগ্রিক খাদ্যনিরাপত্তা ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সুরক্ষায় মোদী-ডিজাইন সরকারের সর্বোচ্চ গুরুত্বের বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে বলে বিশ্লেষকদের অভিমত।
নারীদের জন্য বিশেষ সামাজিক উদ্যোগ হিসেবে রাজ্যে সম্পূর্ণ বিনা ভাড়ায় সরকারি বাসযাত্রা চালুর লক্ষ্যে ৫ Wait কোটি টাকা বরাদ্দের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এই বিশেষ সুবিধা কার্যকর করতে খুব শিগগিরই নারীদের জন্য ‘বিশেষ পরিচয়পত্র’ বা স্মার্ট কার্ড চালু করা হবে। সরকারের মতে, এর ফলে কর্মজীবী, শিক্ষার্থী ও নিম্নআয়ের নারীরা সরাসরি উপকৃত হবেন এবং যাতায়াত খরচ সাশ্রয় হবে।
জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে স্থানীয় উন্নয়নমূলক কাজের পরিধি ও গতি বাড়াতে ‘বিধায়ক এলাকা উন্নয়ন তহবিল’ (MLA LAD)-এর বার্ষিক বরাদ্দ ৭০ লাখ টাকা থেকে একলাফে বাড়িয়ে ১ কোটি টাকা করা হয়েছে। এর ফলে গ্রামীণ ও শহর এলাকায় অবকাঠামো নির্মাণ ও জনকল্যাণমূলক কাজের গতি বহুগুণ বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
অর্থমন্ত্রী তাঁর বাজেট বক্তৃতায় রাজ্যের ভয়াবহ আর্থিক পরিস্থিতির কথাও সততার সাথে তুলে ধরেন। তিনি তথ্য দিয়ে জানান, পূর্ববর্তী তৃণমূল সরকারের কাছ থেকে প্রায় ৮ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকার বিশাল ঋণের বোঝা উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছে বর্তমান নতুন সরকার। এই তীব্র অর্থনৈতিক সংকটের পরিস্থিতিতে একদিকে বিপুল উন্নয়ন ও কল্যাণমূলক কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়া এবং অন্যদিকে রাজ্যের আর্থিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা বর্তমান প্রশাসনের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
বাজেটে কয়েকটি বিশেষ সামাজিক গোষ্ঠীর জন্যও অনন্য ঘোষণা এসেছে। রাজ্যের প্রবীণ ও অবসরপ্রাপ্ত সাংবাদিকদের জন্য মাসিক ৫ হাজার টাকা সম্মাননা পেনশন চালুর কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি, বিগত শাসনামলে রাজনৈতিক কারণে বিভিন্ন সময়ে কারাবন্দি বা রাজনৈতিক নিপীড়নের শিকার ছিলেন এমন ব্যক্তিদের জন্য মাসিক ১০ হাজার টাকা বিশেষ ভাতার ব্যবস্থাও ঘোষণা করা হয়েছে বাজেটে।
বিজেপি সরকারের এই প্রথম বাজেটকে রাজনৈতিক ও নির্বাচনী কৌশলগত দিক থেকেও অত্যন্ত চতুর ও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ, ক্ষমতায় আসার পর বিরোধী শিবিরের প্রধান হাতিয়ার ছিল প্রকল্প বন্ধের ভয়। কিন্তু বাজেটে সেই প্রকল্পগুলো বহাল রাখার পাশাপাশি নতুন সুবিধা যুক্ত করার মাধ্যমে সরকার নিজের ‘জনমুখী ও সর্বজনীন’ ভাবমূর্তি তুলে ধরার চেষ্টা করেছে। অন্যদিকে, প্রধান বিরোধী দল তৃণমূল কংগ্রেস ইতিমধ্যে বাজেটের বিভিন্ন অবাস্তব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন ও অর্থের উৎস নিয়ে কড়া প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছে। সব মিলিয়ে পশ্চিমবঙ্গের নতুন বিজেপি সরকারের প্রথম বাজেট একদিকে সাধারণ মানুষের জন্য উৎসবের আমেজ নিয়ে এসেছে, অন্যদিকে রাজ্যের আর্থিক ভবিষ্যৎ নিয়ে এক নতুন ও দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক বিতর্কেরও সূচনা করেছে।
| প্রধান খাত ও জনমুখী ঘোষণাসমূহ | বাজেটের সুনির্দিষ্ট বরাদ্দ ও স্থিতি |
| মহার্ঘ ভাতা (DA) বৃদ্ধি | একলাফে ২০% বৃদ্ধি; আগামী ১ অক্টোবর থেকে মোট ডিএ দাঁড়াবে ৩৮ শতাংশে। |
| সরকারি ক্ষেত্রে নতুন চাকরি | ১,০০,০০০ (এক লাখ) শূন্যপদে নিয়োগ; যার ১/৩ অংশ নারীদের জন্য সংরক্ষিত। |
| বিদ্যমান সামাজিক প্রকল্প | তৃণমূল আমলের সব জনপ্রিয় কল্যাণমূলক প্রকল্প বহাল ও চালু থাকবে। |
| অন্নপূর্ণা যোজনা (নতুন) | খাদ্যনিরাপত্তা ও দরিদ্রদের সুরক্ষায় রেকর্ড ৩৬,০০০ কোটি টাকা বরাদ্দ। |
| নারীদের জন্য বিশেষ সুবিধা | বিনা ভাড়ায় বাসযাত্রা; যার জন্য বরাদ্দ ৫৫০ কোটি টাকা ও বিশেষ আইডি কার্ড। |
| রাজ্যের উত্তরাধিকার ঋণ | পূর্বতন সরকারের রেখে যাওয়া প্রায় ৮,১৫,০০০ কোটি টাকার ঋণের বোঝা। |
| বিশেষ ভাতা ও পেনশন | সাংবাদিকদের জন্য ৫,০০০ টাকা পেনশন ও রাজনৈতিক বন্দিদের জন্য ১০,০০০ টাকা ভাতা। |
| বিধায়ক উন্নয়ন তহবিল | বার্ষিক এলাকা উন্নয়ন বরাদ্দ ৭০ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ কোটি টাকায় উন্নীত। |
কলকাতা ও পশ্চিমবঙ্গ বিশেষ প্রতিনিধি: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার লাইভ আপডেট, বিজেপি সরকারের নতুন অর্থনৈতিক প্রজ্ঞাপন, নবান্নের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং ভারত-বাংলাদেশের সব এক্সক্লুসিভ ব্রেকিং নিউজের দ্রুত আপডেটের জন্য নিয়মিত ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন
| ফজর | 3:50 AM ভোর |
|---|---|
| যোহর | 12:04 দুপুর |
| আছর | 4:44 PM বিকাল |
| মাগরিব | 6:50 PM সন্ধ্যা |
| এশা | 8:17 PM রাত |
| জুম্মা | 1.30 pm দুপুর |